ফ্রিল্যান্সিং-এর ম্যাধমে কিভাবে সফলতা লাভ করবেন এবং হতাশা দূর করবেন (পর্ব ৩)

Successful freelancing

“ফ্রিল্যান্সিং-এর মাধ্যমে কিভাবে সফলতা লাভ করবেন এবং হতাশা দূর করবেন” এই আর্টিকেল সিরিজের তৃতীয় আর্টিকেল এটি। আগের আর্টিকেল দুটিতে বলেছিলাম ফ্রিল্যান্সিং জিনিসটা কি এবং এই সম্পর্কিত ভুল ধারণাগুলা সম্পর্কে।

পড়ে না থাকলে অবশ্যই পড়ে আসবেন আর্টিকেল দুটি, কারণ ওই আর্টিকেল দুটির সাথে এর সাথে এই আর্টিকেলটি অনেক সম্পর্কিত এবং আগের পর্ব দুইটি না পড়ে থাকলে এই পর্বের অনেক কিছু বুঝতে সমস্যা হতে পারে আপনার।

যাই হোক, প্রথম পর্বটি যদি পড়ে থাকেন, তাহলে আপনাদের মনে থাকার কথা যে আমরা যে সচরাচর ফ্রিল্যান্সিং বলতে যা বুঝি সেটি আসলে আইটি ফ্রিল্যান্সিং, এবং আমাদের কথা হয়েছিল যে আমরা এখন থেকে আর ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি ব্যবহার না করে আইটি ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি ব্যবহার করব, মনে আছে কি?

আমরা সেই কথাতে বহাল থাকতে চাই এই আর্টিকেলেও।

তো যাই হোক, অনেকের প্রথম ভুল ধারণা যে আইটি ফ্রিল্যান্সিং জিনিসটি খুবই সহজ এবং যাকে দিয়ে কোন কিছুই হবে নাহ, মানে গতানুগতিক পড়াশোনা এবং চাকুরি বা ব্যবসা, সে আইটি ফ্রিল্যান্সিং করবে। প্রথম আর্টিকেলে আমি আপনাদের বুঝিয়ে বলেছিলাম কেন কথাটি অত্যন্ত ভুল, এবং এ সম্পর্কিত বাস্তব তুলে ধরেছিলাম।

আরো একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা ছিল। সেটি হচ্ছে, কেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ এসে বেশিরভাগ মানুষ সফল হতে পারছে না এবং হতাশ হয়ে পড়ছে? কেন সাক্সেসের হার এত কম? আবার যারা সাক্সেস্ফুল হচ্ছে তাদের ইনকাম এত বেশি কেন? এই সম্পর্কিত প্রথম কারণ ব্যাখ্যা করেছিলাম দ্বিতীয় আর্টিকেলে।

পরবর্তী কারণগুলা নিয়ে লিখতে যাচ্ছি এই আর্টিকেলে –

কেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ বেশিরভাগ মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে এবং হতাশ হয়ে পড়ছে?

প্রথম কারণ, যথাযথভাবে কাজ না শেখা!

ব্যাখ্যা জানতে চাইলে পড়ে আসুন এই পর্বের দ্বিতীয় আর্টিকেলটি।

পরবর্তী কারণ, কমিউনিকেশন স্কিলের অভাব:

‘সফট স্কিল’ – এই টার্মটির সাথে আপনারা পরিচিত? সফট স্কিল বলতে বোঝায় এমন কিছু স্কিল যা যেকোন কাজ করার প্রয়োজনীয় প্রধান স্কিলের সাথে দরকার হয়।

মনে করেন আপনাকে একটি গ্রুপ এসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হবে। এখন সেই এসাইনমেন্ট সাবমিট করার জন্য আপনাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা রাখার পাশাপাশি আরো কিছু কাজ করতে হবে। যেমন – যেহেতু এটি গ্রুপ ওয়ার্ক,  তাই আপনাকে গ্রুপের সাথে বসে আলোচনা করে সমাধান বের করার ক্যাপাবিলিটি রাখতে হবে।

কিভাবে একটা গ্রুপে মিলেমিশে কাজ করা যায় সেটি জানতে  হবে। এছাড়া হয়ত মাইক্রোসফট অফিসের টুকটাক কাজ জানতে হবে এসাইনমেন্টটি এডিট করার জন্য। এই যাবতীয় স্কিল গুলি সফট স্কিল হিসাবে বিবেচিত হবে এই ক্ষেত্রে।

এরকম কিছু কমন সফট স্কিল আছে যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হবে আপনাদের। এই স্কিল গুলির  মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ করতে পারার স্কিল।

আমি মনে করি, আমাদের মানে বাংলাদেশিদের মধ্যে সার্বিকভাবে এই স্কিলটির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, যেটা আইটি ফ্রিল্যান্সিং এর ক্ষেত্রে বেশি প্রকট।

কারণ, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে দুটি অন্তরায়, প্রথমত কমিউনিকেশন স্কিল, যেমন কখন কোথায় কোন কথা বলতে হয়, কিভাবে বলতে হয়, কিভাবে মানুষকে কনভিন্স করতে হয় এসব স্কিল না থাকা, দ্বিতীয়ত, ইংরাজি ভাল্  ভাবে না জানা।

দেখুন, আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ আপনার সব ক্লায়েন্ট ই হবে বাইরের দেশের, যারা ইংরাজিতে কথা বলে। এখন আপনার যদি ইংরাজির উপর যথাযথ দক্ষতা না থাকে, তাহলে আপনি তাদের সাথে সহজ ও স্বাবলিল ভাবে কমিউনিকেট কিভাবে করবেন?

অনর্গল ইংরাজি বলতে পারা লাগবে না আপনার, এটলিস্ট কিভাবে ফ্লুয়েন্টলি ইংরাজিতে লিখতে হয়, এটলিস্ট কীভাবে আপনি যা বলতে চাচ্ছেন সেটা বোঝাতে হয়, এগুলা তো জানা লাগবেই। ক্লায়েন্ট এর সাথে আপনার যোগাযোগ সঠিক  না হলে আপনার কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।

এজন্য, আপনাকে দুটো কাজ করতে হবে। প্রথমত, ইংরাজি শেখার উপর জোর দিতে হবে। আপনি যদি নিয়ম করে প্রতিদিন কিছুটা সময় ইংরাজি পড়েন, ধরুণ আপনি যে ফিল্ডে কাজ করছেন সেই ফিল্ডে কোন একটা টপিকে ইংরাজিতে লেখা কিছু আর্টিকেল পড়লেন, যে শব্দগুলা নতুন সেগুলার অর্থ জেনে রাখলেন।

এছাড়া আগ্রহি আরো কয়েক জনকে নিয়ে মেসেঞ্জারে একটা গ্রুপ খুলে ফেলেন, যেখানে আপনারা  নিজেদের মধ্যে সব সময়  ইংরাজিতে কথা বলবেন, মানে টেক্সট করবেন আরকি। এরকম আরো অনেক উপায় পাবেন ইংরাজিতে নিজেকে দক্ষ করার। এবং আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে শেখা শুরুর টাইমিং।

আমি সবচেয়ে বেশি রিকমেন্ড করি যখন থেকে কাজ শেখা শুরু করবেন, তখন থেকেই ইংরাজি শেখা শুরু করবেন। আপনি যদি ৬ মাস কাজ সেখার পাশাপাশি ৬ মাস ইংরাজিও চর্চা করেন, আপনি ৬ মাস পর সবদিক থেকেই প্রস্তুত হয়ে যাবেন আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ আপনার পদচারণা শুরূ করার জন্য।

আর তাছাড়া কমিউনিকেশন স্কিল ও প্রাক্টিস করবেন প্রথম থেকেই, যাতে আপনি অলরাউন্ডার হয়ে ওঠেন। অনেক টিপস পাবেন গুগলে কমিউনেকশন স্কিল বাড়ানোর জন্য, সেগুলা ফলো করুন।

পরবর্তী কারণ, দ্রুত টাকার লোভে পথভ্রষ্ট হউয়া

বলেছিলাম না, যারা আইটি ফ্রিল্যান্সিং এ আসে, তারা কেমন জানি দুনিয়ার ব্যস্ততা নিয়ে আসে? তারা খুব দ্রুত বড়লোক হতে চায়? ফলশ্রুতিতে কি হয়, তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে খুব দ্রুত। ৬ মাস সময় দিয়ে কাজ শেখার জন্য তারা প্রস্তুত থাকে না, এবং তারা খুজতে থাকে এমন কোন ওয়ে যেখানে তারা খুব দ্রুত উপার্জন করতে পারবে।

এজন্য তারা আজকে এই কাজ করে, কালকে সেই কাজ করে এবং সহজ কোন উপায় খুজতে থাকে। দেখা যায় একসময় চিন্তা করে ক্লিক করে খুব দ্রুত টাকা উপার্জন করার। আপনাদের সম্ভবত বলার কথা ছিল যে ক্লিক করে টাকা উপার্জনের চিন্তা কেন বুলশিট, সেটাই বলছি এখন –

আচ্ছা আপনি চিন্তা করুন, অনলাইনে যখন আপনি টাকা উপার্জন করবেন, তখন আপনি যে টাকাটা পাবেন, সেটি কি ছাপা হয়ে আপনার কাছে আসবে? না নিশ্চয়? বরং কেউ না কেউ আপনাকে টাকাটা পাঠাবে তাই না? হোক সেটা ডলার বা অন্য কোন কারেন্সিতে। বাট কাউকে না কাউকে তো আপনাকে টাকাটা পাঠাতে হবে তাই না?

তো এবার আপনি বলুন, আপনাকে কেউ এমনি এমনি টাকা কেন পাঠাবে? আপনি যদি তার কোন কাজ না করে দেন বা তার উপকারে না আসেন, তবে সে কেন আপনাকে টাকা পাঠাবে? আপনি ক্লিক করলে কারো কি উপকার হতে পারে যে সে আপনাকে টাকা পাঠাবে? বরং আপনি যখন কারো কোন প্রকৃত কাজ করে দেবেন, কেবলমাত্র তখনই সে আপনাকে টাকা পাঠাবে, তাই না?

এই সহজ জিনিসটিই অনেক মানুষ বুঝতে চায় নাহ। তারা মনে করে ইন্টারনেটে কোন যাদুর খনি আছে, যেটা ক্লিক করলেই টাকা পাঠায়। আপনাকে সহজ জিনিসটি বুঝতে হবে যে ইন্টারনেট শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম মাত্র, যে কাজ করবে তার সাথে যে কাজ করাবে তার।

টাকা উপার্জনের ব্যাসিক যে নিয়ম – যে আপনি কারো কোন কাজ করে দেবেন বিনিময়ে সে আপনাকে টাকা দেবে – এটা সবক্ষত্রেই সঠিক।

এটা জেনে রাখুন যে খুব দ্রুত টাকা উপার্জনের এরকম কোন সৎ ও স্থায়ী রাস্তা নেই, তাই মনোনিবেশ করুন ভালভাবে কাজ শিখে তারপর টাকা উপার্জনের আশা করতে।

আরেকটি কারণ, কন্টিনিয়াস কাজ শিখতে থাকার মেন্টালিটি না থাকা

ছোটবেলায় একটি কথা শুনতাম, যে ডাক্তার হলে নাকি সারাজীবন পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হয়, কারণ নতুন নতুন রোগ আবিষ্কার হবে, তার প্রতিষেধক আবিষ্কার হবে, সেগুলো সম্পর্কে না জানা থাকলে ভাল ডাক্তার হব কিভাবে!

এই ভয়ে ছোটবেলায় ডাক্তার হতে চাইতাম না যে সারাজীবন পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু হায়, শেষমেষ এসে সেরকম কিছুই বেছে নিলাম! আইটি ফ্রিল্যান্সিং একদমই সেরকম কিছু একটা!

আপনারা এটা বোঝেন যে আইটি ফ্রিল্যান্সিং ব্যাপারটাই টেকনোলজি কে ঘিরে, আর আপনার এটা ভাল করেই জানেন যে টেকনোলজি কি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হয়। প্রতিদিন নতুন নতুন ফোন বের হচ্ছে, আগের ফোনগুলা তখন অকেজো মনে হচ্ছে!

ঠিক তেমনি প্রতিদিন নতুন নতুন সফটওয়্যার বের হচ্ছে, একটা কাজ হাজারভাবে করার নতুন নতুন পন্থা বের হচ্ছে। আপনি যদি এগুলা সম্পর্কে না জানেন তাহলে সময়ের সাথে টিকে থাকবেন কিভাবে?

আচ্ছা কখনো প্রেজেন্টেশন বানিয়েছেন? যদি বানিয়ে থাকেন কিসে বানিয়েছেন? নিশ্চয় পাওয়ারপয়েন্ট? কারণ প্রেজেন্টেশন শব্দটা শুনলে ওই একটা ওয়ার্ড এ হয়ত আমাদের মাথায় সবার আগে ঘোরে, তাইনা?

এটি আবার কি? প্রেজি হচ্ছে প্রেজেন্টেশন বানানোর অন্যতম সহজ ও আকর্ষণীয় ওয়েব বেজড সফটওয়্যার। পাওয়ারপয়েন্ট থেকে প্রেজি ব্যবহার করা অনেক বেশি সহজ এবং প্রেজেন্টেশন গুলাও আরো বেশি আকর্ষনীয় হয়, এবং সময় ও কম লাগে।

কিন্তু আপনার হয়ত এটার কথা জানাই ছিলো না। ভার্সিটি তে প্রেজেন্টেশন এনাউন্স হলেই আপনি তাড়াতাড়ি পাওয়ারপয়েন্ট খুলে নিয়ে বসে যেতেন এবং নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে প্রেজেন্টেশন বানাতে লেগে যেতেন, আবার হয়ত দেখা যেত যে স্লাইড মন মত হত নাহ।

কিন্তু আপনার যদি প্রেজির কথা জানা থাকত, তাহলে আপনার অনেক সময় বাচত, কষ্ট কম করা লাগত এবং স্লাইড ও সুন্দর হত, প্রফেসরের প্রশংসা ও পেতেন। কিন্তু কোনটাই হয়নি শুধুমাত্র আপনার লেটেস্ট টেকনোলজি সম্পর্কে অবগত না থাকার কারণে।

তো এই যদি লেটেস্ট টেকনোলজি সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রভাব হয় একজন ছাত্রের জীবনে, তাহলে ভাবুন যার পেশা ই টেক কে ঘিরে, সে যদি লেটেস্ট টেক সম্পর্কে অবগত না থাকে, তাহলে তার কি অবস্থা হতে পারে?

এটা বলেই দেয়া যায় যে সে বেশিদিন মার্কেটে টিকে থাকতে পারবে না, এবং ঠিক এই জিনিশটি ঘটে আমাদের আইটি ফ্রিল্যান্সার দের সাথে। এরা প্রথমে কাজ শেখার সময় একবার কাজ শিখবে, তাও এক্সাক্টলি যা শেখান হবে সেটাই শিখবে, নিজে কোন রিসার্স করে কিছু শিখবে না, আর একবার কয়েকটা কাজ পেলে মনে করবে যা শিখেছি এবার তাই দিয়েই জীবন চালিয়ে দিব।

কিন্তু বাস্তব ঘটনা পুরা উলটা। টেকনোলজি যত দ্রুত আপডেট হবে মার্কেটও তত দ্রুত আপডেট হবে, এবং ভিন্ন ভিন্ন এস্পেক্ট এর আগমন হবে প্রতিটি ফিল্ডে। এগুলা সম্পর্কে আপনার অবশ্যই জানতে হবে নিজেকে আপডেট করার জন্য।

যেহেতু আমাদের আইটি ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে এই মানষিকতা নাই, তাই দেখা যায় তারা কিছুদিন পরেই মার্কেট থেকে ঝরে পড়ে অথবা কাজ পাওয়ার পরিমাণ সমূহভাবে কমে যায়, এবং তারা হতাশ হয়ে পড়ে। এমন সিচুয়েশন এভয়েড করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই শেখা চালিয়ে যেতে হবে, সে আপনি যত বড় আইটি ফ্রিল্যান্সারই হন না কেন!

শেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ও আপনার ইন্ডাস্ট্রি তে পরিবর্তন গুলা সম্পর্কে অবগত থাকার জন্য অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে আপনার ইন্ডাস্ট্রি এর অথরিটি ওয়েবসাইট গুলা ফলো করা। বেশিরভাগ ইন্ডাস্ট্রি এর এক্সপার্টরা ওয়েবসাইট চালায় যেখানে তারা ইন্ডাস্ট্রি এর পরিবর্তন নিয়ে কথা বলে। এসব ওয়েবসাইট আপনার অবশ্যই ফলো করা উচিত।

তো আজ এ পর্যন্তই থাক, পরের আর্টিকেলে পরের বিষয়গুলো নিয়ে কথা হবে ক্ষণ!

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *