গুগল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিন – (১ম পর্ব)

গুগল হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে নাম করা সার্চ ইঞ্জিন। এমন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পাওয়া মুশকিল বা হয়তো পাওয়া যাবে না যে গুগলে দিনে একবার হলেও কোনো না কোনো তথ্যের সন্ধানে বা অন্য কারণে ঢুঁ মারেন না।

গুগলে মাত্র কয়েকটি শব্দ লিখে সার্চ দিলে যে বিশাল তথ্য ভান্ডার গুগল আমাদের সামনে হাজির করে, তথ্য সংগ্রহে তার বিকল্প কোথাও পাওয়া যাবে নাহ। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, গুগলে থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যটি খুঁজে নিতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়। এই যে গুগলের বিশাল তথ্যভান্ডার, এটি মাঝে মাঝে কিন্তু সমস্যার কারণ হয়েও দাঁড়ায়। 

অনেক সময়, বিশেষ করে একাডেমিক রিসার্চের ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্যটি খুঁজে পেতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়। ব্যাপারটার কিছুটা দায় আমাদের উপরেও বর্তায়। এটি অনেক সময় আমাদের ঠিকভাবে সার্চ করতে মা পারার কারণে হয়।

আমরা ঠিকভাবে সার্চ করলে আমাদের ধরা-ছোঁয়ার সকল তথ্যই গুগল থেকে পাওয়া সম্ভব।

উইসলিয়ান ইউনিভার্সিটি এ বিষয়ের উপর একটি সমীক্ষা করেছে যেটা বলছে যে মাত্র ২৫ শতাংশ ছাত্র গুগল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে পারে। আমার ধারণা সে সংখ্যা হয়তো আরো কম আমাদের দেশে । হাতের কাছেই রয়েছে বিশাল এই তথ্যভাণ্ডার, কিন্তু আমরা যথাযথ দক্ষতার অভাবে তার উপযুক্ত ব্যবহার করতে পারছি না।

গুগল সার্চের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশেষ কিছু টেকনিক। কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে আমরা খুব সহজেই গুগল থেকে পেয়ে যেতে পারি আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য। এতে করে আমাদের অনেক সময় এবং এনার্জি সেভ হবে যা আমরা অন্য কাজে লাগাতে পারি।

তো এমনি কিছু টিপস নিয়ে আজকের আয়োজন। এই সহজ টিপসগুলি জানলে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন গুগল সার্চ নিঞ্জা এবং এ্মন সব তথ্য উদ্ধার করে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন যা হয়ত আপনার কোন ফ্রেন্ড বা কলিগ খুজে বের করতে পারে নাই।

তো চলুন দেখা যাক সেই সিক্রেট কিন্তু সিম্পল টিপসগুলি –

 

অধিক সংখ্যক কী-ওয়ার্ড

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গুগলে অনুসন্ধানের সময় আমরা সাধারণত অল্প কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করি। আমরা সার্চ করার সময় যে শব্দগুলি লিখে সার্চ করি, সেগুলোকেই কিওয়ার্ড বলা হয়।

এখন, আমারা যখন কোন কিওয়ার্ড লিখে গুগলে সার্চ করি, তখন গুগল এ সকল শব্দের প্রত্যেকটিকে ইনডেক্স হিসেবে নিয়ে গুগলের লিস্টকৃত সকল সাইটের সকল শব্দগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখে। এরপর যে সাইটগুলিতে আমাদের ওই কিওয়ার্ডের জন্য সর্বাধিক সংখ্যক মিল পাওয়া যায়, গুগল সেই সাইটগুলিকে একে একে পরপর করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে।

এক্ষেত্রে বেস্ট প্রাক্টিস হচ্ছে, অনুসন্ধান করার সময় আপনার টপিক রিলেটেড সর্বাধিক সংখ্যক কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করা, যাতে করে গুগল বুঝতে পারে আমরা কি চাচ্ছি এবং সে হিসাবে আমাদের পছন্দসই সাইট, যেটিতে আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আছে, সেটি সবার উপরে তুলে ধরতে পারে।

আপনি আপনার সার্চ টার্মে যত বেশি রিলেভেন্ট কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করবেন, গুগল তত পরিষ্কার ভাবে বুঝবে আপনার আসলে কি চাচ্ছেন বা আপনার কী প্রয়োজন।

এটাকে একটা বন্ধুকে কিছু বোঝানোর সাথে তুলনা করুন। ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু একটা বোঝাতে চাচ্ছেন। একটা বা দুটো শব্দে কিছু বললে বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কার না-ও হতে পারে, কিন্তু বেশ কয়েকটি শব্দ যদি আপনি বলেন সেক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পর্কে আপনার বন্ধুর ধারণা পরিষ্কার হতে পারে।

গুগলও এখানে ঠিক আপনার বন্ধু মতো। তাকে বেশি বেশি রিলেভেন্ট কিওয়ার্ড দিন। তবেই দেখতে পাবেন, আপনার দরকারি সাইটগুলো গুগল আপনার সামনে হাজির করছে।

আরেকটা ছোট উদাহরণ দেই। ধরুন আপনি ক্রিকেট ব্যাট কিনতে চাচ্ছেন, এবং ক্রিকেট ব্যাট বিক্রি করে এরকম অনলাইন শপ খুজতেছেন। তো আপনি যদি সার্চ করেন শুধুমাত্র ‘cricket bat’ লিখে, তাহলে আপনার সামনে এমন সব ওয়েবসাইট আসবে যারা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে লেখালেখি করে, বা ওরকম কিছু।

কিন্তু আপনি কি চাচ্ছেন? ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে লেখা পড়তে, নাকি ব্যাট কিনে মাঠে গিয়ে খেলতে? ব্যাট কেনাই যদি আপনার লক্ষ্য হয় তাহলে আপনার লেখা উচিত ‘buy cricket bat’। তাহলে সেসব ওয়েবসাইট আপনার সামনে আসবে যারা ক্রিকেট ব্যাট বিক্রি করে।

তবে, এখানেই শেষ হয়। ব্যাপারটা আরো স্মার্টলি সার্চ করা যায়। আপনি  ‘buy cricket bat’ লিখে সার্চ করে এমন কিছু সাইট পেলেন যারা ক্রিকেট ব্যাট বিক্রি করে, কিন্তু দেখলেন যে তাদের সার্ভিস বাংলাদেশে নেই এবং আপনি তাদের থেকে কিনতে পারবেন না, তাহলে লাভের লাভ কি হল??

কিন্তু আপনি যদি ‘buy cricket bat bangladesh’ লিখে সার্চ করেন তাহলে দেখবেন যে আপনার সামনে এবার সেই সব সাইটই আসছে যারা বাংলাদেশে ক্রিকেট ব্যাট বিক্রি করে, এক্সাক্টলি যেটা আপনি চাচ্ছিলেন।

এজন্য গুগলকে বেশি বেশি রিলেভেন্ট কিওয়ার্ড দিন, যাতে সে বুঝতে পারে আপনি ঠিক কি চাচ্ছেন।

স্টপ ওয়ার্ড ব্যবহার না করলেও চলবে

গুগল আপনা থেকেই আপনার সার্চ থেকে কিছু বহুল ব্যবহৃত শব্দকে ফিল্টার করে ফেলে, এবং সেই ওয়ার্ডগুলো সার্চের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাবই রাখে না। তেমন কিছু শব্দ হলো, ইত্যাদি। এছাড়াও গুগল একটি বর্ণ বা সংখ্যাকে ফিল্টার করে দেয়। যেমন: ‘a’।

ধরুন, আপনি গুগল সার্চবারে যেয়ে লিখলেন, ‘how a search engine works’, এখন গুগল নিজের ডাটাবেজে সার্চ করার সময় প্রথমে স্টপ ওয়ার্ডগুলিকে (এক্ষেত্রে how, a) বাদ দিয়ে দিবে। এতে করে আপনার অনুসন্ধান ছোট হয়ে শুধু ’search engine works’ বানিয়ে নিবে। তারপর গুগল নিজের ডাটাবেজে আসল অনুসন্ধান করবে।

তো বুঝতেই পারছেন, এইসব অতিরিক্ত WH words (‘where’, ‘how’, ’what’), ‘and’, ‘the’, ‘or’ ইত্যাদি স্টপ ওয়ার্ড ব্যবহারে অনুসন্ধানের কোনো সুবিধা হচ্ছে না কারণ গুগল তা বাদ দিয়ে সার্চ করছে, বরং পারতপক্ষে বেশি সময় লাগছে – আপনার ক্ষেত্রে ওয়ার্ডগুলো লিখতে, এবং গুগলের ক্ষেত্রে ওয়ার্ডগুলা বাদ দিয়ে আপনার সার্চ কিওয়ার্ডকে ছোট করতে। মানে দুদিক থেকেই সময় লস। তাই যতটা পারা যায়, স্টপ ওয়ার্ড ব্যবহার না করা উত্তম।

কিন্তু কোন কোন সময় দেখা যায় কোনো স্টপ ওয়ার্ড যোগ করা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় কারণ আপনি জানেন যে গুগল যদি এই শব্দ বাদ দিয়ে সার্চ করে তবে আপনার কাংখিত রেজাল্ট পাবে না। ,

সেক্ষেত্রে আপনাকে গুগলকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আপনি চাচ্ছেন গুগল যেন অবশ্যই এ শব্দটি সহ সার্চ করে। এজন্য একটি অপারেটর ব্যবহার করতে হবে। সেটি হচ্ছে ‘+’।  কোনো শব্দের আগে যদি ‘+’ অপারেটর যুক্ত করা হয়ে তবে তা স্টপ ওয়ার্ড হলেও গুগল সে শব্দটিসহ সার্চ করবে।

এটা শুধু স্টপ ওয়ার্ড না, যেকোন ওয়ার্ড এর উপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য প্রযোজ্য।

যেমন: সার্চে how শব্দটি যদি যুক্ত করতে চান তাহলে এভাবে লিখুন ‘ +how’। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন যেন ‘+’ অপারেটর এবং শব্দটির মাঝে কোনোপ্রকার স্পেস না থাকে।

অপারেটর ব্যবহার

উপরে প্রসংগবশত শুধুমাত্র একটি  অপারেটর নিয়ে কথা বলেছি, সেটি হল ‘+’। এছাড়া আরো অনেক অপারেটর রয়েছে যা গুগল সার্চকে আরো বেশি ইফেক্টিভ করে তুলতে পারে।

গুগল সার্চের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপারেটরের ব্যবহার আমাদেরকে নির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য খুজে পেতে সাহায্য করে। একাডেমিক রিসার্চ বা অন্য কোনো তথ্য খুঁজে পেতে, কিংবা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশানের ক্ষেত্রে এই অপারেটরগুলো মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে কাজ করতে পারে।

সার্চ অপারেটরগুলোকে ব্যাসিকালি তিনভাগে ভাগ করা যায় –

ক. বেসিক অপারেটর

  • “ ” (কোট) – আপনি যদি কোনো শব্দ বা শব্দগুচ্ছ (Phrase) কে হুবহু পেতে চান তবে তা উদ্ধৃতি চিহ্নে আবদ্ধ করে সার্চ করুন। যেমন: “albert einstein”।
  • ‘OR’ বা ‘|’ (অর) – আপনি যখন দুটি শব্দ লিখে সার্চ করেন, তখন গুগল সাধারণত দুটি শব্দের মাঝে AND অপারেটর ব্যবহার করে সার্চ করে। তার মানে হল, দুটি শব্দ লিখে গুগলে সার্চ করা হলে ওই দুটি শব্দই যেসব ওয়েব সাইটে আছে শুধুমাত্র সেসব সাইটই গুগল প্রদর্শন করবে। আপনি যদি দুটি শব্দের একটি অথবা অন্যটি খোঁজ করতে চান, তবে আপনাকে OR অপারেটর ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন যে অবশ্যই বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করে OR লিখতে হবে, নয়তো গুগল এই শব্দ টিকে উলটা স্টপ ওয়ার্ড হিসেবে ধরে নেবে ।
  • ( ) (প্যারান্থেসিস) – প্যারেন্থেসিস বা ব্রাকেট অপারেটর ব্যবহার করে কোনো একটি সার্চ কমান্ডকে গ্রুপে বিভক্ত করা যায়। যেমন:

প্যারেন্থেসিস এবং অর অপারেটরের ব্যবহার

  • + (প্লাস) – প্লাস অপারেটর কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা উপরে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
  • – (মাইনাস) – কোনো শব্দকে যদি আপনি স্পেসিফিকালি সার্চ থেকে বাদ দিতে চান তাহলে আপনাকে মাইনাস অপারেটর ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে গুগল করবে কি, ঐ শব্দ যেগুলার আগে মাইনাস আছে, সেই শব্দগুলা যেসব সাইটে আছে তা বাদ দেবে। যেমন:

bass সার্চ করার সময় মাইনাস অপারেটর ব্যাবহার করার মাধ্যমে কিছু শব্দকে ফিল্টার করা হচ্ছে –

  • * (অ্যাসটেরিস্ক) – শব্দগুচ্ছের কোনো শব্দকে যদি আপনি প্রতিস্থাপন করতে চান তার জন্য অ্যাসটেরিস্ক অপারেটর (*) ব্যাবহার করা যায়। এই অপারেটরটি যে শব্দের আগে থাকবে  গুগল ওই শব্দটিকে একটি ব্ল্যাংক শব্দ হিসেবে ধরে নেবে। বিষয়টি ক্লিয়ার করার জন্য উদাহরণ দেয়া যাক।

ধরুন, আমরা সার্চ করবো “Rock and Roll”। কিন্তু এই  phrase টিকে অনেকভাবে লেখা যায়। যেমন: Rock n Roll বা Rock & Roll ইত্যাদি। তাই এক্ষেত্রে যদি আমরা Rock * Roll লিখে সার্চ দেই, সেক্ষেত্রে গুগল মাঝের শব্দটিকে আপাত উহ্য রাখবে এবং সে হিসাবে সার্চের ফলাফল প্রদর্শন করবে। এতে করে মাঝের শব্দটি যে আসলে কী সেটি হিসাব থাকছে না।

তবে আপনি বলতে পারেন যে তাহলে তো Rock Roll লিখে সার্চ করলেই হত। কিন্তু ব্যাপারটি একটু ভিন্ন। Rock * Roll লিখলে গুগল বুঝে নিবে যে আপনি তিন অক্ষরের কিছু একটা সার্চ করছেন, এবং মাঝখানের অক্ষরটি বিভিন্ন ফর্ম্যাট থাকতে পারে। তাই এক্ষেত্রে রিলেভেন্ট রেজাল্ট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, দুই অক্ষরে সার্চ করার থেকে।

#..# (সীমা) – নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে যদি আপনি কোন কিছু সার্চ করতে চান, তাহলে ‘#..#’ অপারেটর ব্যবহার করতে হয়। এক্ষেত্রে হ্যাশ দুটিকে দুটি সময় দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে।

ধরুন আপনি ২০০০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যে ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ গুলো হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে জানতে চান। তাহলে আপনাকে সার্চ করতে হবে cricket world cup 2000..2019।

তো, আজ এপর্যন্তই থাক। পরের পর্বে কিছু অ্যাাডভান্সড অপারেটর ও একাডেমিক রিসার্চ ট্রিক্স নিয়ে কথা বলব।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.