একজন ফ্রিল্যান্সার হিসাবে কিভাবে আপনার বায়ারকে খুশি রাখবেন

একজন ফ্রিল্যান্সার এর কাছে বায়ার-ই সব বলা যায়। বায়ার নেই মানে কাজ নেই – কাজ নেই মানে ফ্রিল্যান্সারের পকেটে ডলার নাই।

আজকাল মার্কেটপ্লেসে এত বেশি কম্পিটিশন হয়ে গিয়েছে যে বায়ার পাওয়া কষ্ট হয়ে দাড়িয়েছে। আজকের ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটে কাজ জানাই সবকিছু না, বরং কিভাবে কাজ পাবেন সেটি জানা আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছে।

যেহেতু বায়ারের বনামে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা অনেক হয়ে দাড়িয়েছে, সেহেতু বায়ার কম পাবেন এটিই স্বাভাবিক। তো এই অবস্থায় মার্কেটে টিকে থাকতে গেলে এবং ভাল করতে গেলে আপনার কাজ হচ্ছে যে কয়জন বায়ার আছে তাদের খুশি রেখে তাদের থেকে কাজ নিতে থাকা।

আপনি যদি কিছু পার্মানেন্ট বায়ার বানাতে পারেন, তাহলে আপনার জন্য ফ্রীল্যান্সিং অনেক সহজ হয়ে যাবে।

এখন কথা হচ্ছে, পার্মানেন্ট বায়ার কিভাবে বানাবেন? পার্মানেন্ট বায়ার বানানোর জন্য শুধু ভাল কাজই কিন্তু সব নাহ!
হ্যা অবশ্যই আপনাকে ভাল কাজ করতে হবে, সেটা তো মাস্ট। তবে এছাড়া আরো কিছু কাজ আছে যা আপনি করতে পারেন বায়ারকে খুশি রাখার জন্য। মনে রাখবেন বায়াররাও মানুষ – তাদের খুশি করতে পারলে তারা আপনাকেই কাজ দিবে।

তো বায়ারকে খুশি রাখার জন্য কি করবেন সে ব্যাপারে আজকে কিছু টিপস দিব। যে টিপসগুলো দেব, সেগুলো খুবই কাজের, আমি নিজে উপকার পেয়েছি। কাজেই আপনি যদি কাজে লাগান তবে নিঃসন্দেহে আপনিও উপকৃত হবেন। ত আসুন শুরু করা যাক।

শুভেচ্ছা কার্ড

বিদেশে বিশেষ দিন উপলক্ষে উপহার দিয়ে বা কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর রীতি আছে। বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা জানালে ওরা খুব খুশি হয়।

প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন বিশেষ দিবস আছে। একটু গুগল করলে লিস্ট পেয়ে যাবেন। ওইসব বিশেষ দিন উপলক্ষে আপনি আপনার বায়ারকে যদি শুভেচ্ছা জানান, তবে বায়ারের সাথে আপনার সম্পর্ক দ্রঢ় হবে। আপানার কাজ পাবার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।

আপনার বায়ার লিস্টের মধ্যে যদি ১০% কে আপনি রেগুলার করতে পারেন তবে আপনি কাজ করে শেষ করতে পারবেন না। আমার এক বায়ার আছে, তার ৭৩ টা কাজ এই পর্যন্ত করেছি, সব ৫ স্টার ফিডব্যাক সহ। আরেক বায়ার আছে, যে আমাকে এই পর্যন্ত ১৭ জন বায়ারে কাছ থেকে কাজ এনে দিয়েছে। আসলে সবই বায়ারের সাথে ভাল রিলেশনের জন্য।

কিভাবে শুভেচ্ছা কার্ড বানাবেন? আমি এই জন্য যে সফটওয়্যার ব্যবহার করি তার নাম হচ্ছে “Picture Collage Maker Pro” খুব সহজেই আপনি এটা দ্বারা কার্ড বানাতে পারবেন। এটা পেইড সফটওয়্যার। একটু Google সার্চ দিলেই ফুল ভার্সন পেয়ে যাবেন। ওদের ওয়েব এর ঠিকানা www.picturecollagesoftware.com।

মাত্র কয়েক ক্লিকেই সুন্দর সুন্দর কার্ড বানাতে পারবেন। এছাড়া আরও অনেক সফটওয়্যার আছে। আপনি আপনার পছন্দ মত ব্যবহার করতে পারেন। কার্ডে অবশ্যই বায়ারে নাম উল্লেখ করে দেবেন। যারা গ্রাফিক্সের কাজ করেন তাদের জন্য এটা অবশ্য অনেক সহজ কাজ।

এরপর বিশেষ দিনে আগেই বায়ারকে কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবেন। আশা করা যায়, আপনি বায়ারের কাছ থেকে ভাল রেসপন্স পাবেন। গত বছর আমি ক্রিস্টমাস উপলক্ষে প্রায় ১০০ জন বায়ারকে কার্ড পাঠিয়েছিলাম। প্রায় ৫০% রেসপন্স পেয়েছিলাম । অনেকেই খুশি হয়ে কাজও দিয়েছিল, এমনকি কয়েকটা টিপসও পেয়েছিলাম।

এটা আসলে একটা চলমান প্রক্রিয়া। আপনি যদি নিয়মিত এই প্র্যাকটিস করেন তবে বায়ারের সাথে রিলেশন ভাল হবে। আপনি এই প্রতিযোগিতামূলক মার্কেটে ভাল করবেন। আরও একটা টিপস দেই সেটা হল বায়ারের কাছে কাজের জন্য কাকুতি মিনতি করবেন না। এতে আপনার কাজ পাবার সম্ভবনা কমে যাবে। নিজের সম্মান বজায় রাখবেন, আমরা ভিক্ষুক নই। কাজ পাবার যোগ্যতা আপানার আছে। যোগ্য লোকের পিছনে কাজ দৌড়ায়।

ইয়ারলি ক্যালেন্ডার

এটাও খুব ইফে্টিভ এবং পরীক্ষিত। আমি নিজে উপকার পেয়েছি।আমরা বায়ারকে মনে করি দুধেল গাই। যত বেশি দুধ দুইয়ে নেয়া যায় ততই লাভ। কিন্তু তারাও যে মানুষ এবং তাদেরও সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনা আছে সেটাও বুঝা উচিত। তাই বায়ারকে যদি মাঝে মাঝে গিফট দেন তবে তারা খুবই খুশি হয়। আপনার সাথে সম্পর্কও ভাল হবে। ফলাফল ডলারের বৃষ্টি।

কাজের কথায় আসি। বছর প্রায় শেষ হয়ে আসছে। নতুন বছরে যদি বায়ারকে বিশেষ কিছু দিয়ে শুভেচ্ছা জানান, তবে নিশ্চয়ই সে আপনাকে সারা বছর মনে রাখবে। সেটা হল নতুন বছরের ক্যালেন্ডার। আপনি যদি বায়ারের কাজ দিয়েই একটা সুন্দর ক্যালেন্ডার বানিয়ে তাকে সারপ্রাইজ দেন তবে এর থেকে ভাল কিছু হতেই পারে না।

গত বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আমি আমার প্রত্যেক বায়ারকে ক্যালেন্ডার গিফট করেছি। প্রতিটা ক্যালেন্ডারই ছিল ইউনিক এবং বায়ারের কাজ দিয়েই ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিলাম। বায়ারের কাজ ডেলিভারি দেয়ার সময় একটা করে ক্যালেন্ডার দিয়ে দিয়েছি। বায়ারকে কিছুই বলিনি। সারপ্রাইজ ছিল ।বায়ারদের এক্সপ্রেশন ছিল দেখার মত। অনেক টিপস এবং প্রশংসা পেয়েছিলাম। এমনকি কাজের পরিমাণও অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

যে কোন ছবি দিয়ে ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য অনেক সফটওয়্যার আপনি পাবেন। তবে আমি যেটা পছন্দ করি সেটা হচ্ছে “Photo Calendar Studio” এই ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে তাদের ওয়েবসাইট www.photocalendarstudio ভিজিট করতে পারেন। এটা পেইড সফটওয়্যার, পকেটে ডলার থাকলে কিনে নিতে পারেন। আর না থাকলে বা আমার মত বেশি কিপ্টা হলে একটু টরেন্ট সার্চ দিয়ে সহজেই নামিয়ে নিতে পারবেন। আপনি যদি গ্রাফিক্স এর কাজ করেন তবে বায়ারের কাজ দিয়েই সুন্দর সুন্দর ক্যালেন্ডার তৈরি করতে পারবেন।

যারা অন্য কাজ করেন তাদেরও কোন সমস্যা নেই। আপনার পছন্দ মত যে কোন সুন্দর ছবি দিয়ে ক্যালেন্ডার বানাতে পারবেন। মাত্র কয়েক ক্লিকেই ১২মাস/৬মাস/৩মাস। এমনকি ১মাসের ১২ পাতার ক্যালেন্ডার বানাতে পারবেন। চাইলে এর উপর গিগ ছাড়তে পারেন। কারন অনেকেই বছরের শুরুতে ক্যালেন্ডারের উপর এই ধরনের গিগ ছাড়ে।

আমি প্রতিবছরই প্রায় প্রত্যেক বায়ারকে ক্যলেন্ডার উপহার দেই ।গতবার প্রায় সব বায়ারকে দিয়েছিলাম, এবারও দেয়ার ইচ্ছা আছে। ফলাফল চমৎকার সেটা আশা করি বলতে হবে না!

আর্টওয়ার্ক

এটাও পরীক্ষিত এবং আমি নিয়মিত ব্যবহার করি এবং ভাল ফল পাচ্ছি। আসলে শুধু কাজ জানলেই হবে না, বায়ার ম্যানেজমেন্টও জানতে হবে। প্রত্যেক সফল ফ্রিলান্সারের বায়ার ম্যানেজমেণ্টের নিজস্ব স্টাইল আছে। যেগুলো তারা সাধারণত কারো সাথে শেয়ার করেন না।

বায়ারকে খুশি রাখার জন্য বিশেষ দিন ছাড়াও আমি মাঝে মাঝে বায়ারকে গিফট দেই। আমার কাছে সবথেকে ইফেন্টিভ মনে হয় আজকের দেয়া টিপসটি। কেমন হয় যদি আপনি বায়ারকে একটা ছবি উপহার দিলেন? যেটা ভিঞ্চি, মনেট বা ভ্যানগঘ থেকে কোন অংশে কম নয়। এবং সেই আর্টিস্ট হচ্ছেন আপনি নিজেই। শুধু তাই নয় বায়ার হাই রেজুলেসনে প্রিন্ট করে তাঁর ড্রইং রুমে টানিয়ে রাখতে পারে। এর থেক ভাল গিফট আর হতে পারে না।

আমি নিজেই মাঝে মাঝে আমার কাছের মানুষদের এই রকম গিফট দেই। তারা খুব খুশি হয়।বায়ারদেরত কথাই নাই।কাজের কথায় আসি। আমি আজকে যে সফটওয়্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিব, তার নাম খুব কম মানুষই জানে।

এই সফটওয়্যারের নাম হচ্ছে “Dynamic Auto Painter Pro” এর বিশেষত হচ্ছে, এটা যে কোন ছবিকে হাই রেজুলেসনের আর্টওয়ার্কে পরিনত করতে পারে । এটা ছবিতে প্রায় ৫০ ধরনের আর্ট ইফেক্ট দিতে পারে। আপনার ছবি দেখে যে কেউ বলবে আপনি একজন বড় মাপের আর্টিস্ট । আরও বিস্তারিত জানতে তাদের ওয়েব সাইট ভিজিট করতে পারেন “www.mediachance.com/dap/index.html”

আমি নেট থেকে অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি নামিয়ে আর্ট ওয়ার্কে কনভার্ট করে রেখে দিয়েছি। সময় সুযোগ বুঝে বায়ারদের আমি এগুলো গিফট দেই। সাধারণত বড় কোন অর্ডার পেলে, বা টিপস পেলে এগুলো বেশি ব্যবহার করি। তারা অনেক খুশি হয়, অনেকে পিসির ওয়াল পেপার হিসাবে ছবি ব্যবহার করে, অনেকেই প্রিন্ট করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে। এটা স্বাভাবিক আপনার ছবি সামনে থাকলে, আপনাকে ভুলে যাওয়া কঠিন।

এটা ৯৯ ডলার দামের পেইড সফটঅয়্যার, কিনে ব্যবহার করলে ভাল। আমার মত কগ্তুস হলে একটু টরেন্ট সার্চ দিন ফ্রি পেয়ে যাবেন।

গিগ সংক্রান্ত বোনাস টিপস

এই আর্টিকেলে আমি তিনটি সফটওয়্যার নিয়ে আলোচনা করেছি। যে গুলো সাধারণত বায়ারকে খুশি করার জন্য । তবে একটু বুদ্ধি খাটালে এই তিনটি সফটঅয়্যার দিয়ে আপনি গিগ বানিয়ে ভাল সেল করতে পারেন।

নতুন বছরের সময় আপনি যদি  ক্যালেন্ডারের উপর গিগ ছাড়েন তবে বেশ কিছু সেল পাবেন। গ্রিটিংস কার্ডের উপর গিগ দিতে পারেন। করন সারা বছর এর চাহিদা থাকে। প্রায় ১৫/২০ ধরনের গ্রিটিংস কার্ড আপনি বানাতে পারবেন। আর পেইন্টিংস এর কথা নাই বললাম। আমার নিজেরই এর উপর গিগ আছে।

আ্যামেরিকানরা কুকুর বেড়াল খুব ভালবাসে । আমি এর উপর গিগ দিয়ে এই পর্যন্ত প্রায় ২০০ ডলার সেল পেয়েছি। ফিভার এ আমি প্রচুর গিগ দেখেছি এই সব সফটওয়্যার দিয়ে করা। সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি একজন টপ রেটেড সেলার পেয়েছি যিনি Dynamic Auto Painter, যেটার কথা উপরে বললাম, সেই  সফটওয়্যার দিয়ে গিগ ছেড়ে টপ রেটেড সেলার হয়ে গেছেন।

সাধারণ কেউ সহজে এই চলাকি ধরতে পারবে না। আমি এটা দেখার পর অনেক্ষন হেসেছি । এই হল আমার গিগ সংক্রান্ত বিশেষ টিপস। কাজে লাগানো আপনার উপর নির্ভর করছে। যদি সবকিছু কাজে লাগাতে পারেন, আশা করি আপনি ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে অনেক ভাল করবেন।

 

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.